বিএসএফ চাষে বদলে গেছে ইমরুলের খামার

 

পাবনা প্রতিনিধিঃ

খামারে মাছ ও মুরগির খাবারের খরচ দিন দিন বাড়ছিল। বাজারনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প ও তুলনামূলক কম খরচের প্রোটিনের উৎস খুঁজতে শুরু করেন পাবনার আটঘরিয়ার তরুণ উদ্যোক্তা মোঃ ইমরুল হাসান। বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ করতে গিয়ে পরিচিত হন ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা বিএসএফ চাষের সঙ্গে।

ধারণাটি ভালো লাগলেও বড় পরিসরে কাজ শুরু করার মতো পর্যাপ্ত মূলধন ছিল না তার। ছোট পরিসরে শুরু করা উদ্যোগটিকে সম্প্রসারণ করতে প্রয়োজন ছিল অবকাঠামো, অর্থ ও কারিগরি জ্ঞানের। এমন সময় ইমরুল হাসানের পাশে দাঁড়ায় টিএমএসএস আটঘরিয়া শাখার স্মার্ট ফিশারিজ প্রকল্প। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তার খামারের চিত্র।

এখন নিজের উৎপাদিত বিএসএফ লার্ভা মাছ ও মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন ইমরুল। তার দাবি, এতে খাদ্য কেনার ব্যয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। নিজের খামারের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত লার্ভা ও বিএসএফের ডিম বিক্রি করছেন অন্য খামারিদের কাছে। পাশাপাশি লার্ভা উৎপাদনের পর অবশিষ্ট জৈব উপাদান থেকে তৈরি করছেন জৈব সার।

খাদ্যের দাম থেকেই নতুন ভাবনা

মাছ ও পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই যায় খাদ্য কিনতে। ফিডের বাজারদর বাড়তে থাকায় অনেক খামারিই উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খান। ইমরুল হাসানও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

কম খরচে মাছ ও মুরগির জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে তিনি বিএসএফের লার্ভা সম্পর্কে জানতে পারেন। বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তিনি বুঝতে পারেন, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের লার্ভা মাছ ও পোল্ট্রির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে জৈব উপাদান কাজে লাগিয়ে এ লার্ভা উৎপাদন করা সম্ভব।

এরপর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট পরিসরে বিএসএফ চাষ শুরু করেন তিনি। পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করতে গিয়ে সম্ভাবনাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে উৎপাদন বাড়াতে গেলে প্রয়োজন বড় শেড, উপযুক্ত নেট হাউস, লার্ভা ও মাছির পৃথক ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম। এখানেই দেখা দেয় মূলধনের সংকট।

সহযোগিতা পেলেন স্মার্ট ফিশারিজ প্রকল্প থেকে

এই অবস্থায় ইমরুল হাসান যোগাযোগ করেন টিএমএসএস আটঘরিয়া শাখার স্মার্ট ফিশারিজ প্রকল্পের সঙ্গে। প্রকল্পের মাঠকর্মীরা তার খামার পরিদর্শন করে উদ্যোগটির সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা নেন।

পরবর্তীতে প্রকল্প থেকে তাকে ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিএসএফ উৎপাদনের পদ্ধতি, খামারের অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বাড়ানো এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হয়।

ঋণের অর্থ ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে খামারে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনেন ইমরুল। বিএসএফ চাষের জন্য বড় শেড নির্মাণ করেন। মাছি ও লার্ভার জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং প্রয়োজনীয় নেট হাউস ও ‘লাভ হাউস’ স্থাপন করেন। ফলে উৎপাদনের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি খামার পরিচালনাও সহজ হয়।

এক উদ্যোগে একাধিক লাভ

বিএসএফ চাষে ইমরুলের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের মাছ ও পোল্ট্রি খামারে উৎপাদিত লার্ভার ব্যবহার। বাইরে থেকে খাদ্য কিনতে হয় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসে।

ইমরুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ লার্ভা ব্যবহারের ফলে তার ফিড ব্যয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তবে তার উদ্যোগের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু খাদ্য ব্যয় কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

নিজের খামারের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত লার্ভা স্থানীয় মৎস্য ও পোল্ট্রি খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন তিনি। পাশাপাশি বিএসএফের ডিমও বিক্রি করছেন। ফলে উৎপাদিত লার্ভা যেমন নিজের খামারে খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত উৎপাদন থেকে তৈরি হচ্ছে বাড়তি আয়।

বিএসএফ চাষের পর অবশিষ্ট জৈব উপাদানও ফেলনা যাচ্ছে না। সেগুলো ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করছেন ইমরুল। উৎপাদিত সারও বিক্রি করছেন তিনি। অর্থাৎ একই উদ্যোগ থেকে খাদ্য ব্যয় কমানো, লার্ভা ও ডিম বিক্রি এবং জৈব সার উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নিজের বিএসএফ খামারে উদ্যোক্তা মোঃ ইমরুল হাসান। 

ছোট উদ্যোগ থেকে বড় স্বপ্ন

সীমিত পরিসরে শুরু করা উদ্যোগটি এখন ইমরুল হাসানের কাছে শুধু নিজের খামারের প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা। বিএসএফ চাষকে আরও সম্প্রসারণ করে উৎপাদন বাড়াতে চান তিনি।

ভবিষ্যতে এলাকার বেকার ও আগ্রহী তরুণদের বিএসএফ চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে তার। তার বিশ্বাস, কম জায়গা ও তুলনামূলক কম মূলধনে শুরু করা সম্ভব হওয়ায় উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের জন্য এটি আত্মকর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে।

ইমরুল হাসান বলেন, “ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই চাষের আইডিয়াটা আমার মাথায় ছিল। কিন্তু পুঁজির অভাবে বড় পরিসরে কাজ করতে পারছিলাম না। টিএমএসএস আটঘরিয়া শাখার স্মার্ট ফিশারিজ প্রকল্প আমার উদ্যোগের ওপর আস্থা রেখে ঋণ সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শও পেয়েছি। তাদের সহযোগিতায় খামারটি বড় করতে পেরেছি। এ জন্য আমি টিএমএসএসের প্রতি কৃতজ্ঞ।”

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত

বাংলাদেশের মৎস্য ও পোল্ট্রি খাতে খাদ্য ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে জৈব বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও পরিবেশ ও উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে বিএসএফ চাষ একসঙ্গে একাধিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ইমরুল হাসানের উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার একটি স্থানীয় উদাহরণ। নিজের খামারের খাদ্য ব্যয় কমানোর পাশাপাশি তিনি বিকল্প একটি ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছেন। উৎপাদিত লার্ভা ও ডিম অন্য খামারিদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন, আবার উৎপাদন-পরবর্তী জৈব উপাদান ব্যবহার করছেন জৈব সার তৈরিতে।

তবে একটি নতুন প্রযুক্তি বা উদ্যোগ সফল করতে শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পরামর্শ এবং বাজারসংযোগ। ইমরুল হাসানের ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কারিগরি পরামর্শও উদ্যোগটিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে।

একসময় সীমিত পুঁজি নিয়ে শুরু করা তরুণ উদ্যোক্তার এই পথচলা তাই শুধু একটি খামারের পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি দেখায়, স্থানীয় পর্যায়ে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ, বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থা এবং যথাযথ সহায়তা পেলে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কতটা বিস্তৃত হতে পারে।

1 Comments

  1. ধন্যবাদ ভাই। একটু কারেশান আছে। থানা ঈশ্বরদী হবে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Previous Post Next Post